ব্যক্তিগত তথ্য
পূর্ণ নাম দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা
জন্ম ৩০ অক্টোবর ১৯৬০
জন্ম স্থান লানুস, বুয়েনোস আইরেস, আর্জেন্টিনা
উচ্চতা ১.৬৫ মিটার (৫’-৫”)
মাঠে অবস্থান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, সেকেন্ড স্ট্রাইকার
দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা একজন আর্জেন্টিনীয় ফুটবল কোচ সেই সাথে একজন ম্যানেজার এবং প্রাক্তন খেলোয়াড়। অনেক বিশেষজ্ঞ, ফুটবল সমালোচক, প্রাক্তন ও বর্তমান খেলোয়াড় এবং ফুটবল সমর্থক তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে গন্য করেন। তিনি ফিফার বিংশ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় পেলের সাথে যৌথভাবে ছিলেন।
মারাদোনাই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুইবার স্থানান্তর ফি এর ক্ষেত্র বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। প্রথমবার বার্সেলোনায় স্থানান্তরের সময় ৫ মিলিয়ন ইউরো এবং দ্বিতীয়বার নাপোলিতে স্থানান্তরের সময় ৬.৯ মিলিয়ন ইউরো। নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারে মারাদোনা আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স, বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া এবং নিওযয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেছেন। ক্লাব পর্যায়ে তিনি তার নাপোলিতে কাটানো সময়ের জন্য বিখ্যাত, যেখানে তিনি অসংখ্য সম্মাননা জিতেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ৯১ খেলায় ৩৪ গোল করেন।
তিনি চারটি ফিফা বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করেন। যার মধ্যে ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপ, যেখানে তিনি আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন এবং দলকে বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেন। প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বর্ণ গোলক জিতেন তিনি। প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয় লাভ করে। আর্জেন্টিনার পক্ষে উভয় গোলই করেন মারাদোনা। দুইটি গোলই ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে দুইটি ভিন্ন কারণে। প্রথম গোলটি ছিল হ্যান্ডবল যা “হ্যান্ড অফ গড” নামে খ্যাত। দ্বিতীয় গোলটি মারাদোনা প্রায় ৬০ মিটার দূর থেকে ড্রবলিং করে পাঁচজন ইংরেজ ডিফেন্ডারকে পাশ কাটিয়ে করেন। ২০০২ সালে ফিফাডটকম এর ভোটাররা গোলটিকে শতাব্দীর সেরা গোল হিসাবে নির্বাচিত করে।
প্রারম্ভিক জীবন
দিয়েগো মারাদোনা ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর বুয়েনোস আইরেস প্রদেশের লানুস
শহরের পলিক্লিনিকো এভিতা হাসপাতালে একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন।
তবে তিনি বেড়ে ওঠেন ভিয়া ফিওরিতোতে, যা বুয়েনোস আইরেসের দক্ষিণ প্রান্তের একটি শান্তিটাউন। তিন কন্যা সন্তানের পর তিনিই ছিলেন বাবা-মা’র প্রথম পুত্র সন্তান। তার ছোট দুই ভাই ররেছে হুগো (এল তুর্কো) এবং রাউল (লালো), যাদের উভয়েই পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। মারাদোনা হলেন ‘চিতরো’ দিয়েগো মারাদোনা এবং ‘দোনা তোতা’ দালমা সালভাদর ফ্রাঙ্কোর পঞ্চম সন্তান। ১০ বছর বয়সে, যখন তিনি এস্ত্রেয়া রোজার হয়ে খেলছিলেন তখন তাকে খুঁজে বের করেন একজন স্কাউট। তিনি দ্য লিটল অনিঅনের (আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের
যুব দল) একজন মূল খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ১২ বছর বয়সে বল-বয় হিসেবে, প্রথম
বিভাগের খেলার অর্ধ বিরতির সময় বল দিয়ে জাদুকরী কারুকার্য দেখিয়ে তিনি
দর্শকদের সন্তুষ্ট করতেন।
ক্লাব ক্যারিয়ার
আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স এবং বোকা জুনিয়র্স
১৯৭৬ সালের ২০ অক্টোবর, নিজের ষোলতম জন্মদিনের দশ দিন আগে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে মারাদোনার অভিষেক হয়। সেখানে তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছিলেন এবং ১৬৭ খেলায় ১১৫টি গোল করেন। এরপর তিনি ১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বোকা জুনিয়র্সে পাড়ি জমান। ১৯৮১ মৌসুমের মাঝামাঝি সময় বোকায় যোগ দিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি প্রথম লীগ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেন।
বার্সেলোনা
১৯৮২ বিশ্বকাপের পর ৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনায় যোগ দেন মারাদোনা।১৯৮৩ সালে, কোচ সিজার লুইস মেনত্তির অধীনে বার্সেলোনা এবং মারাদোনা রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে কোপা দেল রে এবং অ্যাথলেতিক বিলবাওকে হারিয়ে স্পেনীয় সুপার কাপ জিতে। তবে, বার্সায় মারাদোনা কিছুটা খারাপ সময় কাটিয়েছেন। প্রথমে তাকে হেপাটাইটিসের সাথে লড়তে হয় এরপর তাকে পড়তে হয় গোড়ালির ইনজুরিতে। অবশ্য, চিকিত্সা শেষে দ্রুতই মাঠে ফিরে আসেন মারাদোনা।
বার্সেলোনায় মারাদোনা ৫৮ খেলায় ৩৮টি গোল করেন। বার্সেলোনায় থাকাকালে মারাদোনা ক্লাব পরিচালকদের সাথে ঘনঘন বিতর্কে
জড়িয়ে পড়েন, বিশেষ করে ক্লাব প্রেসিডেন্ট ইয়োসেপ লুইস নুনেজের সাথে।
১৯৮৪ সালে, আরেকটি রেকর্ড স্থানান্তর ফি-তে (৬.৯ মিলিয়ন ইউরো) সিরি এ ক্লাব নাপোলিতে যোগ দেন তিনি।
নাপোলি
নাপোলিতে মারাদোনা তার পেশাদার ক্যারিয়ারের শিখরে পৌছান। তিনি খুব
দ্রুত ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সেই সময়টিই ছিল
নাপোলির ইতিহাসের সফলতম যুগ। মারাদোনার অধীনে নাপোলি ১৯৮৬–৮৭ ও ১৯৮৯–৯০
মৌসুমে সিরি এ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে এবং ১৯৮৯–৮৮ ও ১৯৮৮–৮৯ মৌসুমে তারা রানার-আপ হয়। এছাড়া মারাদোনার সময়ে নাপোলি একবার কোপা ইতালিয়া
জিতে (১৯৮৭) এবং একবার রানার-আপ (১৯৮৯) হয় এবং ১৯৯০ সালে ইতালীয় সুপার
কাপ জিতে। ১৯৮৭–৮৮ মৌসুমের সিরি এ-তে মারাদোনা সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। ইতালিতে থাকাকালে মারাদোনার ব্যক্তিগত সমস্যা বৃদ্ধি পায়। তার কোকেইন নেশা বহাল থাকে। অনুশীলনে অনুপস্থিত থাকায় ক্লাবের পক্ষ হতে তাকে ৭০,০০০ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়।ইতালিতে মারাদোনাকে পুত্র সন্তান সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হতে হয়।পরবর্তীতে, মারাদোনা এবং নাপোলিতে থাকাকালে তার অর্জনসমূহের প্রতি
সম্মান জানিয়ে নাপোলির ১০ নম্বর জার্সিটি দাপ্তরিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া
হয়
সেভিয়া, নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ এবং বোকা জুনিয়র্স
ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়ে ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরে ১৯৯২ সালে মারাদোনা নাপোলি ছেড়ে দেন। স্পেনীয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এবং ফরাসি ক্লাব অলিম্পিকে মার্শেই তার প্রতি আগ্রহী হলেও তিনি স্পেনীয় ক্লাব সেভিয়াতে যোগ দেন। সেখানে তিনি এক বছর ছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি লিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেন এবং ১৯৯৫ সালে তিনি বোকা জুনিয়র্সে ফিরে আসেন এবং সেখানে দুই বছর খেলেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কিছু পূর্বে মারাদোনা টটেনহাম হটস্পারের হয়েও মাঠে নামেন ইন্টারন্যাজিওনালের
বিপক্ষে। খেলায় টটেনহাম ২–১ গোলে জয় লাভ করে। তিনি গ্লেন হোডেলের সাথে
খেলেন, যিনি মারাদোনার জন্য তার ১০ নম্বর জার্সিটি ছেড়ে দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে মারাদোনা টানা চারটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করেন। এর মধ্যে ১৯৮৬-এ আর্জেন্টিনা বিজয়ী হয় এবং ১৯৯০-এ হয় রানার-আপ। ১৯৭৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৬ বছর বয়সে হাঙ্গেরির বিপক্ষে মারাদোনার অভিষেক হয়। ১৯৭৯ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহন করেন। প্রতিযোগিতার ফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ৩–১ গোলে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। ১৯৭৯ সালের ২ জুন, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সিনিয়র দলের হয়ে প্রথম গোল করেন মারাদোনা। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ফিফা অনুর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপ (১৯৭৯) ও ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৮৬) উভয় প্রতিযোগিতায় গোল্ডেন বল জিতেছেন।
১৯৮২ বিশ্বকাপ
মারাদোনার ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা ছিল ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ। প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী খেলায় ক্যাম্প ন্যু-তে
আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় বেলজিয়ামের। কাতালান দর্শকরা তাদের ক্লাব
বার্সেলোনায় নতুন যোগ দেওয়া মারাদোনার চমক দেখার জন্য আগ্রহী ছিলেন,
কিন্তু তিনি আশানুরূপ নৈপূন্য প্রদর্শনে ব্যর্থ হন। আর্জেন্টিনা বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১–০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়। গ্রুপ
পর্বের অপর দুই খেলায় হাঙ্গেরি এবং এল স্যালভাদরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা
জয় লাভ করে এবং দ্বিতীয় পর্বে পৌছায়। কিন্তু, দ্বিতীয় পর্বে ইতালি এবং ব্রাজিলের
বিপক্ষে পরাজিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের।
প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনার সবকয়টি খেলায় পুরো সময় মাঠে ছিলেন মারাদোনা।
হাঙ্গেরির বিপক্ষে তিনি দুইটি গোল করেন, তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলা শেষ
হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে ফাউল করার দায়ে তাকে লাল কার্ড দেখানো হয়
১৯৮৬ বিশ্বকাপ
১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মারাদোনা। প্রতিযোগিতার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে
হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। প্রতিযোগিতার পুরোটা জুড়েই ছিল
মারাদোনার আধিপত্য। তিনি আর্জেন্টিনার প্রত্যেকটি খেলায় পুরোটা সময়ই মাঠে
ছিলেন। পুরো প্রতিযোগিতায় তিনি পাঁচটি গোল করেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করান
আরও পাঁচটি। প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম গোল করেন ইতালির বিপক্ষে, গ্রুপ
পর্বে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় খেলায় কোয়ার্টার-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নিজেকে কিংবদন্তী হিসেবে প্রমাণ করেন তিনি।
আর্জেন্টিনা এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে খেলায়
উত্তেজনার কমতি ছিলনা। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবে। দ্বিতীয়ার্ধে,
খেলার ৫১তম মিনিটে মারাদোনা একটি গোল করেন। রিপ্লেতে দেখা যায় গোলটি করার
সময় তিনি হাত দিয়ে বলে আঘাত করেছেন। পরবর্তীতে এই গোলের নাম দেওয়া হয়
“দ্য হ্যান্ড অফ গড”। ২০০৫ সালের ২২ আগস্ট একটি টেলিভিশন শোতে মারাদোনা
শিকার করেন যে তিনি গোলটি ইচ্ছাকৃতভাবেই হাত দিয়ে করেছিলেন, তার মাথা বল
স্পর্শ করেনি এবং সে মূহুর্তে তিনি জানতেন গোলটি অবৈধ। ইংরেজ খেলোয়াড়রা
প্রতিবাদ করলেও রেফারি গোলের বাঁশি বাজান।
Maradona, turns like a little eel, he comes away from trouble, little
squat man... comes inside Butcher and leaves him for dead, outside
Fenwick and leaves him for dead, and puts the ball away... and that is
why Maradona is the greatest player in the world.
“
”
— ব্রায়ন বাটলার (বিবিসি রেডিও)
এর চার মিনিট পরেই মারাদোনা দ্বিতীয় গোল করেন, যেটিকে ফিফা পরবর্তীতে
বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা গোল হিসেবে নির্বাচিত করে। মাঠে নিজেদের অর্ধে
তিনি বল গ্রহন করেন, ইংল্যান্ডের গোলপোস্টের দিকে ঘুরে দাড়ান এবং মাঠের
অর্ধেকেরও বেশি অংশ দৌড়িয়ে, পাঁচ জন ইংরেজ ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে কাটিয়ে গোল করেন। ২০০২ সালে, ফিফা অনলাইনে ভোটের আয়োজন করলে এই গোলটি “শতাব্দীর সেরা গোল” হিসেবে নির্বাচিত হয়।
সেমি-ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও তিনি জোড়া গোল করেন। ফাইনালে, প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি তাকে ডাবল-মার্কিং করে রাখে। তা সত্ত্বেও, তারই বাড়িয়ে দেওয়া পাসে আর্জেন্টিনার পক্ষে জয়সূচক গোল করেন হোর্হে বুরুচাগা। ইস্তাদিও অ্যাজতেকার ১১৫,০০০ দর্শকের সামনে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৩–২ গোলের ব্যবধানে জয় লাভ করে আর্জেন্টিনা।
প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনার ১৪টি গোলের ১০টিতেই মারাদোনার অবদান ছিল,
গোলপোস্টে আর্জেন্টিনার পুরো দলের নেয়া মোট শটের অর্ধেকেরও বেশি ছিল তার
তৈরি করা।
পুরো প্রতিযোগিতা জুড়ে ছিল তার দাপট। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের আতঙ্কের
কারণ ছিলেন তিনি। প্রতিযোগিতায় দূর্দান্ত নৈপূন্য প্রদর্শনের মাধ্যমে
ফুটবল কিংবদন্তীদের খাতায় নিজের নাম লিখিয়ে নেন মারাদোনা।
প্রতিযোগিতা শেষে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মারাদোনাকে গোল্ডেন
বল পুরস্কার দেওয়া হয়। তাকে একক প্রচেষ্টায় বিশ্বকাপ জয়ী হিসেবে
ব্যাপকভাবে গন্য করা হয়।
তার প্রতি সম্মান জানিয়ে স্তাদিও অ্যাজতেকা
কর্তৃপক্ষ স্টেডিয়ামটির সামনে মারাদোনার গোল অফ দ্য সেঞ্চুরীর একটি
প্রতিমূর্তি নির্মাণ করেছে। প্রতিমূর্তিটি স্টেডিয়ামের প্রবেশ পথের সামনে
স্থাপিত।
১৯৯০ বিশ্বকাপ
১৯৯০ বিশ্বকাপে
পুনরায় আর্জেন্টিনার অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন মারাদোনা। কিন্তু,
গোড়ালির ইনজুরির কারণে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের মত নৈপূন্য তিনি দেখাতে পারেননি।
প্রথম পর্বে গ্রুপে তৃতীয় স্থানে থেকেও কোনরকমে দ্বিতীয় পর্বের টিকিট
পায় আর্জেন্টিনা। ১৬ দলের পর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার একমাত্র গোলে জয় পায় তারা, গোলটি মারাদোনারই বানিয়ে দেওয়া ছিল। কোয়ার্টার-ফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় ইয়োগোস্লাভিয়ার।
খেলাটি ১২০ মিনিট পর্যন্ত ০–০ সমতায় শেষ হলে পেনাল্টি পর্যন্ত গড়ায়।
গোলরক্ষকের ডান পাশে নেওয়া মারাদোনার দূর্বল শটটি গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দেন।
তবুও আর্জেন্টিনা ৩–২ ব্যবধানে পেনাল্টিতে জয় লাভ করে। সেমি-ফাইনালে,
ইতালির বিপক্ষে ১২০ মিনিট পর্যন্ত স্কোর ছিল ১–১, ফলে এবারও খেলা গড়ায়
পেনাল্টিতে। এবারও মারাদোনা একই ধরণের শট নেন। তবে এবার বলটি ঠিকটি
গোলপোস্টের জালে জড়ায়। ফাইনালে এবারও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় পশ্চিম
জার্মানির। খেলায় রুডি ফোলারকে ফাউল করার কারণে দেওয়া বিতর্কিত পেনাল্টিতে আনড্রেয়াস ব্রেহমার করা একমাত্র গোলে জয় পায় পশ্চিম জার্মানি।
১৯৯৪ বিশ্বকাপ
১৯৯৪ বিশ্বকাপে মারাদোনা শুধুমাত্র দুইটি খেলায় মাঠে নামেন। এর মধ্যে গ্রীসের
বিপক্ষে তিনি একটি গোল করেন। ড্রাগ টেস্টে এফিড্রিন ডোপিং-এর কারণে তাকে
বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়। নিজের আত্মজীবনীতে মারাদোনা ঐ টেস্ট
সম্পর্কে বলেন যে তার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক তাকে এনার্জি ড্রিংক রিপ ফুয়েল
দেওয়ার কারণে তিনি ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়েছেন। তার দাবি ছিল, পানীয়টির
যুক্তরাষ্ট্রীয় সংস্করণ আর্জেন্টিনীয় সংস্করণের মত নয়, যার মধ্যে ঐ
রাসায়নিক দ্রব্যটি ছিল এবং তার প্রশিক্ষক অনিচ্ছাকৃতভাবে তা ব্যবহার করে।
ফিফা তাকে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করে এবং আর্জেন্টিনাও দ্বিতীয় পর্ব
থেকেই বিদায় নেয়। মারাদোনা আলাদাভাবে এও দাবী করেন যে প্রতিযোগিতায়
অংশগ্রহনের পূর্বে ওজন কমানোর জন্য ঐ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারে ফিফার সাথে
তার একটি চুক্তি হয়েছিল ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর মারাদোনার ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে। পুরো ক্যারিয়ারে তিনি ৯১ খেলায় ৩৪টি গোল করেন।
খেলার ধরণ
মারাদোনার দৈহিক গঠন মাঝারি ধরণের এবং তিনি দৈহিক চাপ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখেন। তার ছোট-ছোট পা তাকে দ্রুত দৌড়াতে সহায়তা করে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে
বেলজিয়ামের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি তার দৈহিক শক্তির পরিচয় দেন।
মারাদোনা ছিলেন একজন কৌশলী খেলোয়াড়। সীমিত জায়গার মধ্যে তিনি নিজেকে
কার্যকরীভাবে নিয়ন্ত্রন করতে পারতেন। খাটো হওয়া সত্ত্বেও, দৈহিক দিক থেকে
তিনি ছিলেন শক্তিশালী। তিনি একজন ডিফেন্ডারের সাথে লম্বা সময় ধরে বল
নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারতেন, যতক্ষণ না তিনি দ্রুত শট নেওয়ার মত
জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন বা কোনো সতীর্থ আক্রমনাত্মক দৌড় শুরু করছেন, যাতে
তিনি তাকে বল পাস করতে পারেন।
মারাদোনার জাদুকরি কিছু রণকৌশলের মধ্যে অন্যতম হল ডান উইঙ্গে পূর্ণ
গতিতে ড্রিবলিং, প্রতিপক্ষের গোল লাইনে পৌছানো এবং সতীর্থদের সঠিক পাস
প্রদান। তার আরেকটি জাদুকরি নৈপূন্য ছিল র্যাবোনা, যা হল পায়ের পিছনের
অংশ ব্যবহার করে এক ধরণের রিভার্স-ক্রস পাস শট। এছাড়া মারাদোনা ছিলেন একজন
বিপজ্জনক ফ্রি কিক গ্রহনকারী।
মারাদোনা ছিলেন একজন বাম পায়ের খেলোয়াড়। এমনকি বলের সাথে ডান পা ভাল
অবস্থানে থাকলেও তিনি বাম পা ব্যবহার করতেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে
তার করা প্রথম গোলটি এর প্রমাণ বহন করে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোল অফ দ্য
সেঞ্চুরি করার সময় তিনি একবারের জন্যেও তার ডান পা ব্যবহার করেন নি, যদিও
তিনি মাঠের ডান পাশ দিয়ে আক্রমন করেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বে
ব্রাজিলের বিপক্ষে মারাদোনা ক্যানিজিয়ার যে গোলে সহায়তা করেন তা ডান
পায়ে করেছিলেন, কারণ ব্রাজিলীয় ডিফেন্ডাররা তাকে এমন অবস্থায় রেখেছিলেন
যে তিনি বাম পা ব্যবহার করতে পারেন নি।
মাদক কেলেঙ্কারি এবং স্বাস্থ সংক্রান্ত বিষয়াবলি
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত মারাদোনা কোকেইনের প্রতি আসক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৮৩ সালে বার্সেলোনায় থাকার সময় থেকে মাদক ব্যবহার শুরু করেন। নাপোলিতে খেলার সময় তিনি নিয়মিত মাদক ব্যবহার করতে শুরু করেন। যা তার ফুটবল দক্ষতায় হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। দিনের পর দিন তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। ২০০০ সালের ৪ জানুয়ারি, উরুগুয়ের
পুন্তা দেল এস্তে-এ ছুটি কাটানোর সময় তাকে দ্রুত একটি স্থানীয় ক্লিনিকের
জরুরি কক্ষে নেয়া হয়। একটি সংবাদ সম্মেলনে চিকিত্সকগন বিবৃত করেন যে
তার হৃৎপিন্ডের পেশীতে ক্ষতি ধরা পড়েছে। পরবর্তীতে জানা যায় যে তার রক্তে
কোকেইন পাওয়া গেছে এবং মারাদোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে পুলিশের কাছে
ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। এই ঘটনার পর তিনি মাদক পুনর্বাসন পরিকল্পনা অনুসরণের
জন্য আর্জেন্টিনা ছেড়ে কিউবাতে চলে যান।
২০০৪ সালের ১৮ এপ্রিল, চিকিত্সকগন প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যে অতিরিক্ত
কোকেইন সেবনের কারণে মারাদোনা মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশনের দ্বারা আক্রান্ত
হয়েছেন। বুয়েনোস আইরেসের একটি হাসপাতালে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা
হয়। তার অসংখ্য ভক্ত ক্লিনিকের চারপাশে ভিড় করে। ২৩ এপ্রিল তার
শ্বাসযন্ত্র খুলে দেওয়া হয়, তবুও ২৯ এপ্রিল মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত
তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তিনি কিউবায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন,
তবে তার পরিবার এর বিরোধিতা করে, তার আইনি অবিভাবকত্ব পরীক্ষা করার জন্য
একটি বিচার বিভাগীয় পিটিশন দায়ের করা হয়। মারাদোনার ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা ছিল। তার খেলুড়ে ক্যারিয়ারের
শেষ থেকে গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারি করার আগে পর্যন্ত তিনি বৃদ্ধিমূলক
স্থূলতায় ভুগছিলেন। ২০০৫ সালের ৬ মার্চ কলম্বিয়ায় তার অস্ত্রোপচার করা
হয়। তার সার্জন বলেন যে মারাদোনাকে এক ধরণের তরল ডায়েট অনুসরণ করে চলতে
হবে, তার স্বাভাবিক ওজন ফিরে পাওয়ার জন্য। যখন মারাদোনা জনসমক্ষে আসতে শুরু করেন, তখন তাকে আগের চেয়ে পাতলা গড়নে দেখা যায়।
২০০৭ সালের ২৯ মার্চ, মারাদোনা পুনরায় বুয়েনোস আইরেসে একটি হাসপাতালে
ভর্তি করা হয়। তাকে হেপাটাইটিস এবং অ্যালকোহোলের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে
চিকিত্সা করা হয়। তাকে ১১ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়,
কিন্তু এর দুই দিন পরই আবার ভর্তি হন। এর পরবর্তী কিছু দিনে তার স্বাস্থ
সম্পর্কে কিছু গুজব ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি একই মাসে তিনবার তার মৃত্যুর গুজব
ছড়ায়।অ্যালকোহোল সম্পর্কিত সমস্যার কারণে একটি মানসিক ক্লিনিকে স্থানান্তরের পর তাকে ৭ মে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ৮ মে, আর্জেন্টিনীয় টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে মারাদোনা
উপস্থিত হন এবং বলেন যে তিনি বিগত আড়াই বছর যাবত্ মাদক ব্যবহার ছেড়ে
দিয়েছেন।
পরিসংখ্যান
| মৌসুম | ক্লাব | লীগ | লীগ | কাপ | মহাদেশীয় | অন্যান্য | মোট | |||||
|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|
| উপস্থিতি | গোল | উপস্থিতি | গোল | উপস্থিতি | গোল | উপস্থিতি | গোল | উপস্থিতি | গোল | |||
| ১৯৭৬ | আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স | প্রিমেরা দিভিশন | ১১ | ২ | – | – | – | ১১ | ২ | |||
| ১৯৭৭ | ৪৯ | ১৯ | – | – | – | ৪৯ | ১৯ | |||||
| ১৯৭৮ | ৩৫ | ২৫ | – | – | – | ৩৫ | ২৫ | |||||
| ১৯৭৯ | ২৭ | ২৬ | – | – | – | ২৭ | ২৬ | |||||
| ১৯৮০ | ৪৫ | ৪৩ | – | – | – | ৪৫ | ৪৩ | |||||
| ১৯৮১ | বোকা জুনিয়র্স | ৪০ | ২৮ | – | – | – | ৪০ | ২৮ | ||||
| ১৯৮২–৮৩ | বার্সেলোনা | লা লিগা | ২০ | ১১ | ৫ | ৩ | ৪ | ৫ | ৬ | ৪ | ৩৫ | ২৩ |
| ১৯৮৩–৮৪ | ১৬ | ১১ | ৪ | ১ | ৩ | ৩ | – | ২৩ | ১৫ | |||
| ১৯৮৪–৮৫ | নাপোলি | সিরি এ | ৩০ | ১৪ | ৬ | ৩ | – | – | ৩৬ | ১৭ | ||
| ১৯৮৫–৮৬ | ২৯ | ১১ | ২ | ২ | – | – | ৩১ | ১৩ | ||||
| ১৯৮৬–৮৭ | ২৯ | ১০ | ১০ | ৭ | ২ | ০ | – | ৪১ | ১৭ | |||
| ১৯৮৭–৮৮ | ২৮ | ১৫ | ৯ | ৬ | ২ | ০ | – | ৩৯ | ২১ | |||
| ১৯৮৮–৮৯ | ২৬ | ৯ | ১২ | ৭ | ১২ | ৩ | – | ৫০ | ১৯ | |||
| ১৯৮৯–৯০ | ২৮ | ১৬ | ৩ | ২ | ৫ | ০ | – | ৩৬ | ১৮ | |||
| ১৯৯০–৯১ | ১৮ | ৬ | ৩ | ২ | ৪ | ২ | ১ | ০ | ২৬ | ১০ | ||
| ১৯৯২–৯৩ | সেভিয়া | লা লিগা | ২৬ | ৫ | ৩ | ৩ | – | – | ২৯ | ৮ | ||
| ১৯৯৩–৯৪ | নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজ | প্রিমেরা দিভিশন | ৫ | ০ | – | – | – | ৫ | ০ | |||
| ১৯৯৫–৯৬ | বোকা জুনিয়র্স | ২৪ | ৫ | – | – | – | ২৪ | ৫ | ||||
| ১৯৯৬–৯৭ | ১ | ০ | – | ১ | ০ | – | ২ | ০ | ||||
| ১৯৯৭–৯৮ | ৫ | ২ | – | – | – | ৫ | ২ | |||||
| মোট | আর্জেন্টিনা | ২৪২ | ১৫০ | – | ১ | ০ | – | ২৪৩ | ১৫০ | |||
| স্পেন | ৬২ | ২৭ | ১২ | ৭ | ৭ | ৮ | ৬ | ৪ | ৮৭ | ৪৬ | ||
| ইতালি | ১৮৮ | ৮১ | ৪৫ | ২৯ | ২৫ | ৫ | ১ | ০ | ২৫৯ | ১১৫ | ||
| ক্যারিয়ারে সর্বমোট | ৪৯২ | ২৫৮ | ৫৭ | ৩৬ | ৩৩ | ১৩ | ৭ | ৪ | ৫৮৯ | ৩১১ | ||
| আর্জেন্টিনা জাতীয় দল | ||
|---|---|---|
| সাল | উপস্থিতি | গোল |
| ১৯৭৭ | ৩ | ০ |
| ১৯৭৮ | ১ | ০ |
| ১৯৭৯ | ৮ | ৩ |
| ১৯৮০ | ১০ | ৭ |
| ১৯৮১ | ২ | ১ |
| ১৯৮২ | ১০ | ২ |
| ১৯৮৩ | ০ | ০ |
| ১৯৮৪ | ০ | ০ |
| ১৯৮৫ | ১০ | ৬ |
| ১৯৮৬ | ১০ | ৭ |
| ১৯৮৭ | ৬ | ৪ |
| ১৯৮৮ | ৩ | ১ |
| ১৯৮৯ | ৭ | ০ |
| ১৯৯০ | ১০ | ১ |
| ১৯৯১ | ০ | ০ |
| ১৯৯২ | ০ | ০ |
| ১৯৯৩ | ৪ | ০ |
| ১৯৯৪ | ৭ | ২ |
| মোট | ৯১ | ৩৪ |

Post a Comment